বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে শনিবার দুপুরে ঢাকায় এসেছেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সফরকে “একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক” আখ্যা দিয়েছে। এটিই ঢাকায় গত ১৩ বছরে কোনো পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম সরকারি সফর।
দুই দিনের সফরের প্রথম দিনই তিনি সাক্ষাৎ করেছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতিনিধিদলের সঙ্গে।
সরকারি সূচি অনুসারে রবিবার পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা এসকে বশির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আলোচনায় বাণিজ্য, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, প্রশিক্ষণ ও ভ্রমণ–এই খাতে চার থেকে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক (MoU) সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ঢাকা সফর করছেন। বিশেষ ফ্লাইটে শনিবার দুপুরে ঢাকায় পৌঁছার পর ইসহাক দারকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম।
সফররত পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে শনিবার সন্ধ্যায় বৈঠক করেছেন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। এরপর তাঁরা নৈশভোজেও অংশ নেন।
বৈঠকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে উপস্থিত ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সেলিমা রহমান। এ ছাড়া বৈঠকে অংশ নেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী এবং দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য শামা ওবায়েদ।
এদিকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে তাঁর বাসভবনে যাবেন সফররত পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত খালেদা জিয়ার বাসায় যাবেন তিনি। শনিবার সন্ধ্যায় এ তথ্য জানান বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান।
এর আগে, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল শনিবার বিকেলে ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনে সফররত পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠক শেষে হাইকমিশনের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘আমরা পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের মন্ত্রীর আমন্ত্রণে এখানে এসেছি। বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক বাণিজ্য, পারস্পরিক সম্পর্ক আরো কীভাবে জোরদার করা যায় এবং দুটি ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে বিনিময় কিভাবে বৃদ্ধি করা যায়, সে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এ ছাড়া সার্ককে কিভাবে আরো কার্যকর ও শক্তিশালী করা যায় তা নিয়েও আলাপ হয়েছে।’
এদিকে, শনিবার বিকেলে পাকিস্তান হাইকমিশনে ইসহাক দারের সঙ্গে বৈঠক করে এনসিপির সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। এনসিপি নেতারা পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের অতীতের বৈরী সম্পর্ক থেকে বের হয়ে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একাত্তরের ইস্যু পাকিস্তানের ‘ডিল’ করা উচিত বলে বলেছে দলটি। সাংবাদিকদের এসব কথা জানান এনসিপি সদস্যসচিব আখতার হোসেন।
রবিবার ঢাকায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা-পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি ও পাঁচটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা রয়েছে।
সম্ভাব্য চুক্তিটি হলো দুই দেশের সরকারি ও কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের ভিসা বিলোপ বিষয়ে। স্বাক্ষরের জন্য সম্ভাব্য এমওইউগুলো হচ্ছে—দুই দেশের বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন, সংস্কৃতিবিনিময়, দুই দেশের মধ্যে ফরেন সার্ভিস একাডেমির মধ্যে সহযোগিতা, দুই রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ও পাকিস্তানের ইসলামাবাদ পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইপিআরআই) মধ্যে সহযোগিতা।
ইসহাক দারের সম্মানে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংযুক্তি, কৃষি, নানা পর্যায়ে চলাচল সুগম করাসহ দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয় আলোচনায় থাকবে। পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ে বৈঠকের ধারাবাহিকতায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক হচ্ছে। এ বৈঠকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বোঝাপড়া ও অভিন্ন স্বার্থের বিষয়ে জোর দেবে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগের সম্পর্ক যেখানে এসেছে, তা এগিয়ে নিতে হলে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সুরাহার কথা বলা হবে। বিশেষ করে একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়া, আটকে পড়া পাকিস্তানিদের প্রত্যাবাসন ও অবিভাজিত সম্পদে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা প্রদান—ঐতিহাসিক এ তিন ইস্যুর সুরাহা চাইবে বাংলাদেশ। সফর শেষে রাতেই পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঢাকা–ইসলামাবাদে কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। ইসহাক দারের চলতি সফরটি গত দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশে পাকিস্তান থেকে মন্ত্রী পর্যায়ের তৃতীয় সফর। পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান গত বুধবার ঢাকায় এসেছেন। এর আগে গত জুলাইয়ে বাংলাদেশ সফর করেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি।
দীর্ঘ ১৫ বছর বিরতির পর গত এপ্রিলে বাংলাদেশ-পাকিস্তান পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের পরপরই পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের ঢাকা সফরের কথা থাকলেও কাশ্মীর সংকটের কারণে সফরটি স্থগিত হয়েছিল।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক টানাপড়েন দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেও আওয়ামী লীগ সরকার দৃশ্যমান সাড়া দেয়নি। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারও পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখার নীতি অনুসরণ করছে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৫ । ৩:১১ অপরাহ্ণ