টিকটক দ্রুত তাদের তথ্য সংগ্রহের পরিধি বাড়াচ্ছে। শুধু অ্যাপ ব্যবহার না করলেই যে আপনি নিরাপদ থাকবেন, বিষয়টি তেমন নয়। তবে কয়েকটি সহজ পদক্ষেপ নিলে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
টিকটক অ্যাপের ভেতরে ব্যবহারকারীদের কার্যকলাপ ট্র্যাক করে, এটি অনেকেরই জানা। কিন্তু খুব কম মানুষ জানেন, অ্যাপের বাইরে অন্য ওয়েবসাইটেও টিকটক ব্যবহারকারীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। এমনকি আপনি যদি কখনও টিকটক ব্যবহার না-ও করে থাকেন, তবুও আপনার তথ্য তাদের কাছে পৌঁছাতে পারে সহজেই।
সম্প্রতি দেখা গেছে, বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে ক্যানসার শনাক্তকরণ, বন্ধ্যত্ব পরীক্ষা, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যও টিকটকের কাছে পাঠানো হচ্ছে। এই তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সীমা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। নতুন কিছু ফিচার যুক্ত হওয়ায় এই নেটওয়ার্ক আরও বড় হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিবর্তনের পেছনের প্রেক্ষাপট
২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের কার্যক্রম নতুন মালিকানায় যাওয়ার পর ব্যবহারকারীদের নতুন তথ্য সংগ্রহ নীতিতে সম্মতি দিতে হয়। এর অংশ হিসেবে চালু হয়েছে একটি নতুন বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে টিকটক অন্য ওয়েবসাইটেও লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন দেখাতে পারে। এই ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে তাদের ট্র্যাকিং টুল আপডেট করা হয়েছে।
কীভাবে কাজ করে এই ট্র্যাকিং পদ্ধতি
এখানে মূল ভূমিকা রাখে একটি প্রযুক্তি, যাকে বলা হয় পিক্সেল। এটি খুবই ছোট একটি অদৃশ্য কোড, যা ওয়েবসাইটে বসানো থাকে। ব্যবহারকারী কোনো ওয়েবসাইটে গেলে পিক্সেল তার কার্যকলাপ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে এবং বিজ্ঞাপনদাতার কাছে পাঠায়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি অনলাইন জুতার দোকান তাদের সাইটে পিক্সেল বসাল। ফলে কে কোন জুতা দেখছেন, কিনছেন বা আগ্রহ দেখাচ্ছেন, সেই তথ্য বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে যায়। এতে বিজ্ঞাপন আরও নির্দিষ্টভাবে দেখানো সম্ভব হয়।
সমস্যা তৈরি হয় যখন এই প্রযুক্তি স্বাস্থ্য বা ব্যক্তিগত সংকটসংক্রান্ত তথ্যও সংগ্রহ করতে শুরু করে। একটি সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কেউ যদি কোনো স্বাস্থ্য সহায়তা সাইটে গিয়ে নিজের অসুস্থতার তথ্য দেন, সেই তথ্যও পিক্সেলের মাধ্যমে টিকটকের কাছে পৌঁছাতে পারে। এমনকি ই-মেইল ঠিকানাও পাঠানো হতে পারে।
টিকটকের দাবি, ওয়েবসাইটগুলোকেই গোপনীয়তা আইন মানতে হয় এবং সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার করা নিষিদ্ধ। তবে সমালোচকদের মতে, প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো ধীরে ধীরে মানুষের অনলাইন জীবনের বড় অংশে নজরদারি বিস্তৃত করছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যমতে, বিশ্বের শীর্ষ ওয়েবসাইটগুলোর প্রায় ৫ শতাংশে টিকটকের ট্র্যাকার রয়েছে। তুলনামূলকভাবে গুগলের ট্র্যাকার রয়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ এবং মেটার রয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ সাইটে। অর্থাৎ এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, বরং পুরো ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার অংশ।
ঝুঁকি কোথায়
ব্যক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন দেখানো অনেকের কাছে সুবিধাজনক মনে হতে পারে। কিন্তু এসব তথ্য যদি অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ব্যবহার করে মানুষকে প্রভাবিত করা হয়, তাহলে ঝুঁকি তৈরি হয়। এর মাধ্যমে ভোক্তাকে নির্দিষ্ট পণ্য কিনতে প্রলুব্ধ করা, রাজনৈতিক প্রচারণায় প্রভাব বিস্তার করা বা ভিন্ন ভিন্ন দামে পণ্য দেখানোর মতো কাজও সম্ভব।
ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ডেটা অতীতে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন ও বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগেও জড়িয়েছে।
নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন যেভাবে
ভালো খবর হলো, কিছু সহজ পদক্ষেপ নিয়ে আপনি ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারেন।
প্রথমত, তুলনামূলকভাবে গোপনীয়তা-সুরক্ষিত ওয়েব ব্রাউজার ব্যবহার করুন। গবেষণায় দেখা গেছে, বহুল ব্যবহৃত কিছু ব্রাউজার অন্যগুলোর তুলনায় বেশি তথ্য ফাঁস করে। গোপনীয়তা-ভিত্তিক ব্রাউজার ব্যবহার করলে ট্র্যাকিং অনেকটাই কমে যায়।
দ্বিতীয়ত, ব্রাউজারে ট্র্যাকার ব্লকার বা বিজ্ঞাপন ব্লকার এক্সটেনশন ব্যবহার করতে পারেন। বিশ্বস্ত উৎস থেকে পাওয়া এক্সটেনশন ব্যবহার করা জরুরি। অনেক অ্যাড ব্লকারও ডেটা সংগ্রহের কোড আটকে দিতে সক্ষম।
তৃতীয়ত, বিভিন্ন ওয়েবসাইটে একই ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার না করার চেষ্টা করুন। কারণ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একই ইমেইল বা তথ্য ব্যবহার করলে সেগুলো মিলিয়ে আপনার অনলাইন আচরণ সহজে শনাক্ত করা যায়।
টিকটকের নিজস্ব অ্যাপেও কিছু গোপনীয়তা সেটিং রয়েছে, যার মাধ্যমে সংগৃহীত ডেটা মুছে ফেলার অনুরোধ করা যায়। যাদের অ্যাকাউন্ট নেই, তারাও প্রয়োজনে ডেটা মুছে ফেলার আবেদন করতে পারেন।
তবে মনে রাখতে হবে, এসব পদক্ষেপ শতভাগ সুরক্ষা দেয় না। অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো নিজেদের সার্ভার থেকে সরাসরি তথ্য বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠায়, যা ব্যবহারকারীর পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
বড় সমাধান কোথায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল সমাধান শক্তিশালী গোপনীয়তা আইন এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এটি শুধু একটি প্ল্যাটফর্মের বিষয় নয়, বরং পুরো বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি ব্যবস্থার সমস্যা। ব্যবহারকারীদের সচেতনতা এবং আইনপ্রণেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি না হলে বড় পরিবর্তন আসা কঠিন।
ডিজিটাল যুগে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে। আপনি কোনো অ্যাপ ব্যবহার না করলেও আপনার অনলাইন কার্যকলাপ বিভিন্ন মাধ্যমে সংগ্রহ করা হতে পারে। তবে সচেতন ব্যবহার, নিরাপদ ব্রাউজার ও ট্র্যাকার ব্লকার ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারে সতর্কতা আপনাকে অনেকটাই সুরক্ষা দিতে পারে। পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর নীতিমালা ও জবাবদিহিতা, যাতে প্রযুক্তি মানুষের সুবিধার জন্য কাজ করে, ব্যক্তিগত জীবনে অযাচিত নজরদারির জন্য নয়।
সূত্র: বিবিসি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ১১:১২ পূর্বাহ্ণ