কানাডার নাগরিকত্ব আইনে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ফলে এখন কয়েক মিলিয়ন আমেরিকান নাগরিকের সামনে খুলে গেছে কানাডীয় পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ। কানাডা তার বংশানুক্রমিক নাগরিকত্ব আইনে বড় ধরনের সংস্কারের পথে অগ্রসর হচ্ছে। নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের জন্য আনা বিল সি-৩ সম্প্রতি রাজকীয় অনুমোদন পেয়েছে যা বাস্তবায়নের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ‘সেকেন্ড-জেনারেশন কাট-অফ’ নামে পরিচিত যে সীমাবদ্ধ বিধান বহু কানাডীয় নাগরিকের বিদেশে জন্ম নেওয়া সন্তানদের নাগরিকত্ব প্রদানকে বাধা দিত, সেই নিয়ম বাতিল করতে সরকার একটি নতুন আইন আনছে। বিল সি-৩ সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট (২০২৫) সংশোধন আইন গত সপ্তাহে রয়্যাল অ্যাসেন্ট পেয়েছে।
মূলত ‘বিল সি-৩’ পাসের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ‘প্রজন্মগত সীমাবদ্ধতা’ বাতিল করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে শঙ্কিত আমেরিকানদের জন্য এক নতুন আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কানাডা সরকার এক বিবৃতিতে বলেছে, এই পদক্ষেপ সিটিজেনশিপ অ্যাক্টকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। একই সঙ্গে কানাডীয় নাগরিকত্বের মান অক্ষুণ্ন রাখছে। এখন থেকে পুরোনো নিয়মে বাদ পড়া কানাডীয়রা তাদের বিদেশে জন্ম নেওয়া বা দত্তক নেওয়া সন্তানদের কাছে নাগরিকত্ব পৌঁছে দেওয়ার ন্যায্য ও সুস্পষ্ট উপায় পাবে।
কানাডার ইমিগ্রেশন, রিফিউজি ও সিটিজেনশিপ মন্ত্রী লিনা মেটলেজ ডিয়াব বলেন, ‘বিল সি-৩ আমাদের নাগরিকত্ব আইনে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধান করবে এবং বিদেশে জন্মানো বা দত্তক নেওয়া সন্তানসহ পরিবারগুলোর জন্য ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনবে। এটি আগের আইনে বাদ পড়া মানুষদের নাগরিকত্ব দেবে এবং ভবিষ্যতের জন্য আধুনিক পরিবার কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুস্পষ্ট নিয়ম স্থাপন করবে। এসব পরিবর্তন কানাডীয় নাগরিকত্বকে আরো শক্তিশালী ও সুরক্ষিত করবে।
কী আছে নতুন আইনে?
২০০৯ সাল থেকে কার্যকর থাকা ‘ফার্স্ট জেনারেশন লিমিট’ বা প্রথম প্রজন্মের সীমাবদ্ধতা অনুসারে, বিদেশে জন্ম নেওয়া কানাডীয়দের সন্তানদের জন্য নাগরিকত্ব পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্ট এই আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পর সরকার নতুন বিল পাস করে।
কারা কানাডীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য হবেন
নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর, যারা আইনের প্রবর্তনের আগের জন্ম এবং যাদের পুরোনো প্রথম-প্রজন্ম সীমা বা অতীতের অন্য পুরোনো বিধান না থাকলে নাগরিকত্ব পাওয়া সম্ভব ছিল Í তারা কানাডীয় নাগরিকত্ব পাবেন। এ ছাড়া বিদেশে জন্মানো বা দত্তক নেওয়া কোনো কানাডীয় অভিভাবক তার বিদেশে জন্মানো বা দত্তক নেওয়া সন্তানকে নাগরিকত্ব দিতে পারবেন, যদি তিনি কানাডার সঙ্গে যথেষ্ট দৃশ্যমান সম্পর্ক দেখাতে পারেন এবং এই সন্তান আইন কার্যকর হওয়ার তারিখে বা এর পর জন্মায় বা দত্তক হয়।
সরকার বলেছে, এই পদ্ধতি পরিবারগুলোর জন্য ন্যায্যতা নিশ্চিত করে এবং একই সঙ্গে এই নীতি জোরালো করে যে বংশানুক্রমিক নাগরিকত্বের ভিত্তি হওয়া উচিত কানাডার সঙ্গে প্রকৃত ও প্রমাণযোগ্য সম্পর্ক।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী:
২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বরের আগে বিদেশে জন্মগ্রহণকারী যে কেউ যদি তার কানাডীয় পূর্বপুরুষের প্রমাণ দিতে পারেন, তবে তিনি নাগরিকত্বের যোগ্য হবেন। এক্ষেত্রে পূর্বপুরুষ কত প্রজন্ম আগের, তা আর বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। তবে ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এর পরে জন্ম নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে, তাদের অভিভাবকদের কানাডায় অন্তত তিন বছর বসবাসের প্রমাণ দিতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কানাডায় বসবাস না করলে নাগরিকত্ব পেলেও আমেরিকানদের বাড়তি কোনো কর (ট্যাক্স) দিতে হবে না। কানাডা কেবল তার বাসিন্দাদের ওপর কর আরোপ করে, পাসপোর্টধারীদের ওপর নয়।
কবে আইন কার্যকর হবে
তবে আইনটি এখনো কার্যকর হয়নি। ফেডারেল সরকারকে এখন কার্যকর হওয়ার তারিখ ঠিক করতে হবে। তবুও রাজকীয় অনুমোদনের ফলে এটি স্পষ্ট যে অটোয়া এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে চায়। বিলটি বহুদিন ধরে কানাডায় চলে আসা ‘দ্বিতীয় প্রজন্মের কাট-অফ’ সমস্যার সমাধান করতে চলেছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশে জন্ম নেওয়া কোনো কানাডিয়ান নাগরিক যদি তার সন্তানকেও বিদেশে জন্ম দেন, তবে সেই সন্তানের স্বয়ংক্রিয়ভাবে কানাডার নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার থাকে না। এই নিয়মের কারণে তৈরি হয়েছে তথাকথিত ‘হারিয়ে যাওয়া কানাডিয়ানদের’ একটি দল- যাদের ধারণা ছিল তারা নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য, কিন্তু পুরনো আইন তাদের সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।
সরকার জানিয়েছে, বিলটি কার্যকর হবে অর্ডার-ইন-কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্ধারিত একটি তারিখে, যা পরে প্রকাশ্যভাবে জানানো হবে। ততদিন পর্যন্ত প্রথম-প্রজন্ম সীমার প্রভাবে থাকা ব্যক্তিদের জন্য অন্তর্বরতী ব্যবস্থা বহাল থাকবে।
কেন ঝুঁকছেন আমেরিকানরা?
নিউইয়র্কের বাসিন্দা এবং ডেমোক্র্যাট অ্যাক্টিভিস্ট এলেন রবিলাড এই পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ২০১৬ সালে ট্রাম্পের প্রথম জয়ের পর থেকেই তিনি কানাডায় চলে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। তার মা নোভা স্কটিয়ায় জন্মালেও আইনি জটিলতায় তার ১৯ বছর বয়সী ছেলে এতদিন নাগরিকত্বের অযোগ্য ছিল।
রবিলাড জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া হুমকি এবং ক্রমবর্ধমান সহিংসতা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তিনি বলেন, ‘নোভা স্কটিয়ার শান্ত জীবন এবং মানুষের ইতিবাচক আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে আমি সরাসরি গাড়ি চালিয়ে কানাডায় চলে যাওয়ার বিকল্প পথটি হাতে রাখতে চাই।’
যোগ্যতা ও আবেদন প্রক্রিয়া
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলেই প্রায় তিন মিলিয়ন যোগ্য আমেরিকান রয়েছেন যাদের পূর্বপুরুষরা ১৮৭০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে কানাডা থেকে দক্ষিণে চলে এসেছিলেন।
আবেদন করার জন্য প্রয়োজনীয় নথি:
১. পূর্বপুরুষের জন্ম সনদ বা বাপ্তিস্মের রেকর্ড।
২. বংশপরিচয়ের সঠিক প্রমাণাদি।
৩. বর্তমানে আবেদনের প্রক্রিয়াকরণে সময় লাগছে প্রায় ১১ মাস।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ট্রাম্প বিরোধী ‘নো কিংস’ বিক্ষোভ, সরকারি অচলাবস্থা এবং কঠোর অভিবাসন নীতির প্রেক্ষাপটে অনেক আমেরিকানই এখন একটি ‘প্ল্যান-বি’ বা দ্বিতীয় বিকল্প খুঁজছেন। কানাডার এই উদার নাগরিকত্ব নীতি তাদের সেই সুযোগটিই করে দিচ্ছে।
পুরোনো আইনটি কী ছিল
দেশটির অভিবাসন সংস্থা ইমিগ্রেশন, রিফিউজি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা (আইআরসিসি) জানায় যে বংশগত নাগরিকত্বের ‘প্রথম প্রজন্ম সীমা’ ২০০৯ সালে চালু করা হয়েছিল। যার অর্থ, যদি কোনো শিশু কানাডার বাইরে জন্ম নেয় বা দত্তক নেওয়া হয়, এবং তার কানাডিয়ান বাবা-মাও যদি বিদেশে জন্ম নেওয়া বা দত্তক নেওয়া হন, তাহলে সেই শিশু বংশগতভাবে কানাডিয়ান নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে না। এই সীমা অনুযায়ী, কোনো শিশু যদি কানাডার বাইরে জন্মায় বা দত্তক হয়, তবে সে নাগরিকত্ব পাবে না যদি তার কানাডীয় অভিভাবকও কানাডার বাইরে জন্মে বা দত্তক নেওয়া হয়ে থাকেন। এই সীমাবদ্ধতা বহু ভিন্নদেশের বংশদ্ভুত কানাডীয়দের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করেছিল, যাদের সন্তান বিদেশে জন্মেছিল।
২০২৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্ট অব জাস্টিস রায় দেয়, বংশানুক্রমিক নাগরিকত্বের প্রথম-প্রজন্ম সীমা সংশ্লিষ্ট সিটিজেনশিপ অ্যাক্টের গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো অসাংবিধানিক। কানাডা সরকার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেনি, কারণ তাদের মতে এই আইন বিদেশে জন্মানো কানাডীয়দের সন্তানের জন্য ‘অগ্রহণযোগ্য’ ফলাফল তৈরি করেছিল।
সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘লস্ট কানাডিয়ানস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ডন চ্যাপম্যান বলেন, আধুনিক কানাডীয় পরিবারের বৈশ্বিক গতিশীলতাকে প্রতিফলিত করতে সিটিজেনশিপ অ্যাক্টকে হালনাগাদ করার মাধ্যমে সরকার নাগরিকত্ব প্রাপ্তিকে আরো ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত করেছে।
কানাডিয়ান ইমিগ্রেশন ল’য়ার্স এসোসিয়েশন (সিআইএলএ) বিলসি-৩ কে সংসদের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন বিষয়ক স্থায়ী কমিটিতে জোরালো সমর্থন জানিয়েছে। তারা বলছে, বিল সি-৩ অবশেষে এই অসাংবিধানিক বাধা দূর করতে চলেছে।
বিল সি-৩ পুরনো নিয়মে নাগরিকত্ব হারানো ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব পুনরুদ্ধার করবে। এছাড়া এর মাধ্যমে বিদেশে জন্ম নেওয়া কানাডিয়ান পিতামাতা, যারা কানাডার সাথে সংযুক্ত, তাদের সন্তানদেরও নাগরিকত্ব দেওয়া যাবে। আইনে উল্লেখযোগ্য সংযোগ হিসেবে বলা হয়েছে, জন্ম বা দত্তকের আগে পিতা-মাতাকে ১,০৯৫ দিন কানাডায় থাকতে হবে।
আইনটি এখন মন্ত্রিসভার আদেশের মাধ্যমে কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। আদালত ইতোমধ্যেই আইনটি কার্যকর করার সময়সীমা ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়িয়েছে। ফলে আইআরসিসি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার জন্য অতিরিক্ত সময় পেয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে আবেদনকারীর সংখ্যা বাড়ার আশা করছেন অভিবাসন আইনজীবীরা। সূত্র: এনডিটিভি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬ । ১১:৩৫ অপরাহ্ণ